মাও এলাকায় দিন দুয়েক


ঘাসের ডগার একফোঁটা শিশির বিন্দুর সৌন্দর্য্য নিরুপন করা যেমন কঠিন তেমনি আমাদের ধারে কাছে কত সৌন্দর্য্য, তার কত রূপ, কত বিশ্ময় আছে তা কল্পনাই করা যায় না চার দেওয়ালের ভিতর থেকে। তাই তো মাঝে মধ্যেই মনে হয় এই চার দেওয়ালের গন্ডী পাড় হয়ে বেড়িয়ে পড়ি কাছে পিঠে কোথাও। আর সে কথা মাথায় রেখেই অফিসের কয়েকজন কলিগ মিলে সম্প্রতি ঘুরে আসি পুরুলিয়া থেকে। পুরুলিয়া, বিশেষ করে অযোধ্যা পাহাড় এলাকার কথা শুনতে অনেকেই নাক শিঁটকেছিলেন। আবার কেউ কেউ তো মাওবাদী এলাকার কথা ভেবে ভয়ও পেয়েছিলেন। তবে আমাদের এক কলিগের কথার উপর ভিত্তি করে বেড়িয়ে পড়লাম।
আগে থেকে টিকিট করে রাখা হাওড়া-চক্রধরপুর এক্সপ্রেসে রওনা হাইকোর্টের জনাকয়েক কলিগ মিলে। রাতের ট্রেনে রওনা দিয়ে সকাল ৯টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম পুরুলিয়া স্টেশনে। স্টেশনটা যে শুধুই বড় তাই নয়, বেশ জাকজমকপূর্নও। আগে থেকেই গাড়ি ও বাঘমুন্ডিতে গেষ্ট হাউসের ব্যবস্থা করা ছিল। স্টেশন থেকে যেতে যেতেই এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোহিত আমরা। পাহাড়ের উপরের সারি সারি গাছপালার মধ্যে দিয়ে রাস্তা। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম গেষ্ট হাউসে।
গরম বাদ দিয়ে বাকি সব কিছুই এতক্ষন পর্যন্ত আমাদের পক্ষে ছিল। কিন্তু সেটাও এতক্ষনে আমাদের দিকে চলে এল। বিকালে কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই শুরু হল প্রচন্ড ঝড় ও বৃষ্টি। অত্যাধিক গরমের মধ্যে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন আমাদের মনকে উতফুল্ল করে তুলল। ঘরের ব্যলকনিতেতে দাঁড়িয়ে এত ঘন গাছপালা পরিবেষ্টিত পরিবেশে ঝড় বৃষ্টির আনন্দ উপভোগ করাটাও ইট কাঠের জঙ্গলে বাস করা আমাদের কাছে এক বড় পাওনা। বিকালে সেখানকার স্থানীয় কারিগরদের তৈরি ছৌ-নৃত্যের সামগ্রী উতপাদন কেন্দ্র ঘুরে দেখলাম। কি অসাধারণ কলাকৌশলে তৈরি নিখুঁত এক একটি মুখোশ সেটা হয়তো বলে বর্ণনা করা যাবে না।
পরদিন অযোধ্যা পাহাড় ও বামনী ফলস দেখার পালা। এই জায়গাগুলি ঘুরে দেখানোর জন্য স্থানীয় থানা থেকে আমাদের একজন গাউডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। প্রথমে আমরা যে অঞ্চলে থামলাম সেটি একটি জলাধারের নিম্নাংশ। জানতে পারলাম এটি ছিল একটি জাপানি কোম্পানির হাইডেল প্রোজেক্ট। পাহাড়ের গায়ে পাথর বসিয়ে যে এত শক্তপোক্ত, নিখুঁত, অসাধারণ পরিকল্পনা করা যায় তা নিজের চোখে না দেখলে হয়ত বিশ্বাসই হত না। আপার ড্যাম অংশটি আরও চিত্তাকর্ষক। একটি বড় হ্রদ ও তার চারপাশের পাথর দিয়ে বাধানো অংশ দেখতে দেখতেই অনেক সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়।
এবার আমাদের গন্তব্য অযোধ্যা পাহাড়ের চূড়োর দিকে। আমাদের সঙ্গে থাকা গাউডের কাছ থেকে জানতে পারলাম এখনকার চারপাশের জঙ্গলে কত হিংস্র জন্তু, এমনকি বাঘের অস্তিত্বও মাঝে মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। দেখতে দেখতে পৌঁছে যায় পাহাড়ের চূড়োয়। এখানে দর্শনীয় তেমন কিছু না থাকলেও এটা দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম যে পাহাড়ের এত উপরেও এমন একটি গ্রাম রয়েছে, রয়েছে দোকানপাটও।
এবার আমাদের যাত্রা শুরু বামনী ফলসের দিকে। প্রথমটা দেখে মনে হয়েছিল খুব সাধারণ একটি জলধারা। কিন্তু পাহাড়ের গায়ে বড় বড় পাথরে ধাপ দিয়ে যতই নিচে নামতে লাগলাম ততই সেটি সুন্দর থেকে সুন্দরতর হতে লাগল। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় অনেকগুলি জলধারা নেমে গিয়েছে নীচের বিশাল গিরিখাতের দিকে। সেখানকার সুন্দর পরিবেশ, নাম না জানা বিভিন্ন রকমের গাছপালা, ঝরনার পরিস্কার জলধারা সব মিলিয়ে যেন সত্যিই অসাধারণ।
পরদিন পুরুলিয়া সদরে পাড়ি। সেখান থেকে ঘুরে নেওয়া রাজমহল পাহাড় ও জয়চন্ডী পাহাড়। দুপাশে ধু ধু মাঠ আর মাঝেমধ্যে ছোট ছোট পাহাড়। অঞ্চলটি এতটাই রুক্ষ যে গাছপালার ধরনও বদলে গিয়েছে। দেখতে দেখতে পৌঁছে যাওয়া একটি পাহাড়ের সামনে। পাহাড়ের মাথায় জয়চন্ডী মাতার মন্দির। সেখানে হেটেই উঠতে হবে। পাহাড়ের গাঁ বেয়ে ঘোরানো পথে সিড়ি। প্রথমে কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও আমরা কয়েকজন উপরে উঠতে লাগলাম। ওপরে উঠে যা দেখলাম তা হয়তো বাকি যারা নীচে ছিল তারা সত্যি সত্যিই মিস করে গিয়েছিল। মন্দির দেখার পাশাপাশি ওপর থেকে মনে হয়েছিল যেন কোন মরুভূমির মাঝে দাড়িয়ে আছি। যতদূর চোখ যায় ধূ ধূ প্রান্তর আর তার মাঝে মাঝে কিছু গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এখান থেকে দেখা দূর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়ার দৃশ্যও মনের মনিকোটরে থেকে যাবে বহুদিন।

 

 

লেখক:

অনিমেশ তালুকদার