পূণ্যভূমি হরিদ্বার


বেশ কিছুদিন থেকেই মন চাইছিল কোথাও থেকে ঘুরে আসি। আর প্রথমেই মনে পড়ল হিন্দুতীর্থস্থান হরিদ্বারের কথা। হাওড়া থেকে হাওড়া-দেরাদুন উপাসনা এক্সপ্রেসের টিকিটও পেয়ে গেলাম। গুছিয়ে ফেললাম ভ্রমণের তল্পিতল্পা। বিকেল নাগাদ পৌছলাম হরিদ্বার।
পুরাণে উল্লিখিত মায়াপুরী আজকের পবিত্র হিন্দুতীর্থ হরিদ্বার। সপ্তপুরীর অন্যতম এই হরিদ্বারের পূর্বের নাম ছিল কপিলাস্থান। হর ও হরির সহাবস্থান ঘটেছে উত্তরাঞ্চল রাজ্যের সাহারানপুর জেলায় শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ২৯২ মিটার উঁচুতে। আর হরির দ্বার নাম থেকেই আজ হরিদ্বার। আবার সারা গাড়োয়াল হিমালয়ে হর অর্থাৎ মহাদেবের মহিমার অন্ত নেই। সে কারনে হরিদ্বারকে আজ অনেকে হর-কি-দুয়ারও বলেন। পূর্ব দিকে চন্ডী পাহাড়, পশ্চিমে মনসা পাহাড়- এরই মাঝে হরি-কি-পাউরিকে কেন্দ্রমণি করে শহরও গড়ে উঠেছে গঙ্গার পশ্চিমে দেবভূমি হরিদ্বার।
গঙ্গা হলো এখানকার মূল আকর্ষণ। ঘরে বসে গঙ্গার শোভা দেখব বলে কিছুটা দরদস্তুর করে হরি-কি-পাউরি ঘাট এলাকার একটা হোটেলে উঠলাম। পাহাড় থেকে হরিদ্বারের হরি-কি-পাউরি ঘাটে গঙ্গা নামছে সমতলে। এখানে মূল গঙ্গার প্রবাহেরও বদল হয়েছে। শহরের উত্তরে ভীমগোদায় বাঁধ দিয়ে কৃত্তিমস্রোত তৈরি হয়েছে। এখানেই গঙ্গা মাতার মন্দির। এছাড়াও শতসহস্র দেবদেবীর মন্দির। সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে আকাশপানে চাইতেই বিল্ব পর্বতের এক টিলার উপরে শ্বেতশুভ্র শিখর শিরে দেখা মিলল মনসা দেবীর মূর্তি। কিছুটা টাঙায় গিয়ে বাকিটা পায়ে হেটে পৌঁছে গেলাম। দেবী দর্শণের সাথে গঙ্গাও সুন্দরভাবে দেখা মিলল মন্দির থেকে। বিকেলে গঙ্গার ঘাটে শিকল ধরে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার সঙ্গে স্নান সেরে মিলল তৃপ্তি। এবার সূর্যাস্তের পালা। ঘাট সেজে উঠেছে মাঙ্গলিক আলোক মালায়। সূর্যাস্তে হরি-কি-পাউরি ঘাটে ৬ জন পুরোহিতের একসঙ্গে ১০০৮টি প্রদীপের গঙ্গারতি, সেই সঙ্গে ভজন। বহু পূণার্থীর মত সন্ধ্যাপ্রদীপ দিলাম মা গঙ্গাকে। দুলকি চালে গঙ্গায় ভেসে চলা হাজারও সন্ধ্যাপ্রদীপের আলোকমালায় চোখ জুড়িয়ে গেল।
পরদিন পায়ে পায়ে বেড়িয়ে পড়া। শহরের দক্ষিণ-পূর্বে শীর্ণকায় মূল গঙ্গার অপর পাড়ে ৫ কিমি পূর্বে নীল পর্বতের চূড়োয় চন্ডীমন্দির। নীল পাহাড় থেকে লালদিওয়ালা ড্যামটির দৃশ্যও অপরূপ। পরে হরিদ্বার শহর থেকে ৫ কিমি দক্ষিণের কনখলে দুর্গা মন্দির, দক্ষ প্রজাপতি মন্দিরে দশ অবতার মূর্তি, শ্রী জগতগুরুর আশ্রমে কালী, রাধামাধব, রাজরাজেশ্বরী, মৃত্যুঞ্জয় মন্দিরে ১৫১ কেজি পারদে তৈরি লিঙ্গরূপী শিব, মানব কল্যাণে অর্ধনারীশ্বর সহ আরও বেশ কিছু মন্দির দেখে নিলাম। একদিন নয়, পরপর চারদিন গঙ্গাপাড়ের এই মনোরম শহরে কোথা দিয়ে কেটে গেল তা টের পাওয়া গেল না। তারপর আবার মনখারাপ করা দিনে কল্লোলিনী কলকাতায় ফেরত আসা।

 

 

লেখক:

সুনিল বিশ্বাস