প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পহেলগাঁও


অনেকদিন থেকেই ভূস্বর্গ যেন টানছিল। এবারে কয়েকদিন ছুটির ব্যবস্থা হতেই কাশ্মীর ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভূস্বর্গ কাশ্মীর উপত্যকার সুন্দর পাহাড়ি শহর পহেলগাঁও যাব না তা তো হয় না। শ্রীনগর থেকে নিয়মিত চলা বাসে যাওয়া যেতে পারে। তবে ভাড়া গাড়িতে চেপে শ্রীনগর থেকে পৌঁছে যাওয়া যায় রূপসী পহেলগাঁওতে। আমরা ভাড়া গাড়িতেই শ্রীনগর থেকে রওণা হয়েছিলাম ৯৪ কিমি দূরে ২১৯৫ মিটার উঁচুতে লিডার নদীর তীরে পাইন-চিনার-দেবদারুতে ছাওয়া রূপসী পহেলগাঁও। আর এই চলার পথে দেখে নিয়েছিলাম আরও কিছু দর্শনীয় জায়গা।
প্রথমেই পথে পড়ে পামপুর। শ্রীনগর থেকে ১৩ কিমি দূরে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ জাফরান চাষ। স্পেন ছাড়া মাত্র এখানেই জাফরানের চাষ হয়। গাড়ি থেকেই পথের দুধারে এই চাষ চোখে পড়ে। আরও কিছুটা এগোলে সংগ্রামা। এখানেই মেলে উইলো কাঠের সন্ধান। এই কাঠের তৈরি ক্রিকেট ব্যাটের সুখ্যাতি জগৎজোড়া। পামপুর থেকে ১৬ কিমি দূরে অবন্তীপুর। এখানে প্রাচীন দুটি মন্দির অবন্তীস্বামী বিষ্ণুমন্দির ও অবন্তীশ্বর শিবের মন্দির ঘিরে গড়ে উঠেছে জনপদ। এখান থেকে ২১ কিমি দূরে খানাবল। খানাবল থেকে ২ কিমি দূরে অনন্তনাগ। পাহাড় থেকে নামছে ঝরনা। দুপাশে দুটি কুন্ড। মাঝে মন্দির; নাম-অনন্তনাগ। জনশ্রুতি, বড় কুন্ডটি বিষ্ণুর শয্যা অনন্তনাগের বাস। একটি কুন্ডের জল ঠান্ডা, অপরটি গরম। মন্দিরে পূজা হয় শিব ও রাধাকৃষ্ণের। বাঙালি পুরোহিত বংশ-পরম্পরায় পূজার্চনা করে আসছেন। অনন্তনাগ থেকে ২৬ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে কোকরনাগ। কোকর অর্থ মুরগি, আর নাগ হল সর্প। অসংখ্য মুরগির পায়ের ছাপ রয়েছে পাহাড়ের গায়ে। সেই ছাপ দিয়ে বেড়িয়ে আসছে জলের ধারা। আর এখানে রয়েছে সুন্দর গোলাপ বাগিচা। বাগিচার রকমারি মরসুমি ফুল মুগ্ধ করবে পর্যটকদের। কোকরনাগ থেকে ১৫ কিমি দূরে ২৪৩৮ মিটার উঁচুতে কাশ্মীরের শৈলাবাস ডাকসুম। এখানে সুন্দর প্রকৃতির মাঝে রয়েছে ট্যুরিষ্ট বাংলো। অনন্তনাগ থেকে ১০ কিমি দূরে ভাবন। এখান থেকে হাঁটা পথে মার্তন্ড মন্দিরে যেতে হয়। পূজা হয় সূর্যোদেবের। আর ভাবন থেকে ৩৩ কিমি দূরে ১২টি শৈলশিখরে ঘেরা ছোট্ট পাহাড়ি শহর পহেলগাঁও।
অপরূপা পহেলগাঁও রূপে অতুলনীয়। পহেলগাঁও অর্থাৎ পয়লা গাঁও। পহেলগাঁও-এর উপর দিয়ে কলকল শব্দে বয়ে চলেছে লিডার নদী। তারই ধার ঘেঁসে চলেছে আঁকাবাঁকা পথ। পথের দুপাশে দোকানপাট, বাড়ি-ঘর, হোটেল, ট্যুরিষ্ট অফিস নিয়ে গড়ে উঠেছে পহেলগাঁও শহর। বরফে ছোঁয়া শৃঙ্গগুলি দুর থেকে পর্যটকদের হাতছানি দেয়। সারা বছরই শৃঙ্গগুলি বরফে ঢাকা থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রাচীন মন্দির। মন্দির থেকে শহরের দৃশ্য অপরূপ। এখান থেকে ৫ কিমি দূরে রয়েছে তৃণাচ্ছাদিত সুন্দর প্রকৃতি বৈশরণ। ১১ কিমি দূরে ৩৩৫৩ মিটার উঁচুতে রয়েছে তুলিয়ান লেক। যেমন সুন্দর চলার পথ তেমনই সুন্দর এর প্রকৃতি। পহেলগাঁও থেকে ৩৬ কিমি দূরে রয়েছে কোলহাই হিমবাহ। কোলহাই-এর পথে পড়বে হিমালয়ের অতুলনীয় নিসর্গের আরু উপত্যকা। পাহাড়ি গুর্জরদের বাস এখানে। আরুতে রয়েছে সবুজের সমারোহ ও বরফে মোড়া পাহাড়। ট্রেক করার ইচ্ছে হলে ১১ কিমি এগিয়ে ৩০৪৮ মিটার উঁচু লিডরিওয়াট পৌঁছে যাওয়া যায়। সবুজ কার্পেটে মোড়া নৈসর্গিক শোভার আর এক লীলাভূমি লিডারওয়াট। পহেলগাঁওয়ের আরও দুটি বিখ্যাত স্থান হল চন্দনবাড়ি ও বেতাবভ্যালি। পাইন-চির-আখরোটে ছাওয়া ২৮৯৫ মিটার উচ্চে ছোট্ট গঞ্জ চন্দনবাড়ি। সারা বছরই এখানে বরফে ঢাকা থাকে। গরম পোশাকের পসরা নিয়ে বসে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আপনি চাইলে পোষাক ও জুতো ভাড়াও নিতে পারেন। এই চন্দনবাড়ি থেকেই শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। বেতাবভ্যালি পর্যটকদের জন্য অপর একটি আকর্ষনীয় জায়গা। সুন্দর একটি পার্কের গা ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে লিডার।

 

 

 

চেকলিষ্ট:

হাওড়া থেকে জম্মু-তাওয়াই যাওয়ার হিমগিরি, জম্মুতাওয়াই এক্সপ্রেসে দুদিন-দুরাত কাটিয়ে জম্মু। জম্মু থেকে শ্রীনগর হয়ে পহেলগাঁও পৌছানো যায়। থাকার প্রচুর হোটেল রয়েছে পহেলগাঁওতে। সিজন অনুযায়ী রেট বাড়ে-কমে। তাপমাত্রা কম থাকার জন্যে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে। তাই যথেষ্ট শীতবস্ত্র সঙ্গে রাখুন।

 

লেখক:

জয়ন্ত নন্দী