সবুজ দ্বীপের অন্দরমহলে


স্বামীর চাকরি সূত্রে আন্দামানে পা রেখেছিলাম। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেলাম। আমাদের ঘরটা ছিল ঠিক মেরিনা বীচের কাছেই।অসম্ভব সুন্দর মেরিনা বীচ। ব্যাকড্রপে পাহাড়, সামনে সমুদ্র। দূরে দেখা যাচ্ছে সুন্দর একটা দ্বীপ, রস আইল্যান্ড। পাশেই রামকৃষ্ণ মিশন। চোখ খুলেই এই দৃশ্য দেখতে যে কেউই এর প্রেমে পড়তে বাধ্য। আন্দামান পৌঁছানোর পরদিনই গিয়েছিলাম রস-এ। অপূর্ব তার ভঙ্গি। যত কাছে যায় তত তাকে স্পর্শ করার অনুভূতি টের পাওয়া যায়। চারপাশ সমুদ্র দিয়ে ঘেরা। সারি সারি নারকেল গাছ। বহু প্রাচীন বট গাছ আজও সব কিছুর সাক্ষী। চোখে পড়বে হরিণের দল। এই দ্বীপে রয়েছে চার্চ, জাপানী বাঙ্কার, মিউজিয়াম। রয়েছে পাউরুটি তৈরির কারখানাও। তবে সাধারণ মানুষের এখানে রাত্রি বাস করার অধিকার বা সুযোগ নেই। এখানে একমাত্র থাকেন ইন্ডিয়ান নেভির কিছু সদস্য। তাই অসাধারণ এই দ্বীপের মায়া কাটিয়ে ফিরতেই হল। সন্ধের বাতাস গায়ে লাগিয়ে বোটে দুলতে দুলতে আবার মেরিনা বীচে।
রাতের আকাশটা থমথমে। হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি। পরদিন সকালে বেড়াতে যাওয়ার অনিশ্চয়তার কথা ভেবে তখন মন কিছুটা ভারাক্রান্ত। তবে সকালে রোদের হাসি মুখ দেখে ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম নীল দ্বীপের উদ্দেশ্যে। এখানে জলের রঙ নীল। সমুদ্রের নীচে ভর্তি কোরাল। নরস্কেলিং করে অথবা গ্লাস বোটেও দেখা যায়। অসাধারণ।সমুদ্রে ঢেউ নেই। শান্ত জল। অনেক দূর পর্যন্ত সমুদ্রে নেমে স্নান করা যায়। সমুদ্রের বীচের পাশে বন পেরিয়ে কোরাল ব্রীজ দেখা একটা বাড়তি পাওনা। প্রচুর বিদেশীদের দেখা মেলে এখানে। এবার সীতাপুর বীচ। এখানে সূর্যাস্ত দেখা যেন অসীমের মাঝে নিজেকে খুঁজে ফেরা। চারিদিকে নানা নাম না জানা ফুল। মন যেন সমুদ্রের মতই উচ্ছ্বল হয়ে উঠেছে। সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য দেখে হোটেলের ঘরে ফেরা। পরদিন লঞ্চে উঠলাম। চলে এলাম হ্যাভলক। মাঝে মাঝে ডলফিনের ঝাঁক মুখ বাড়িয়ে অচেনা অতিথিদের দেখে নিচ্ছে। দ্বীপে পৌছাতেই চোখে পড়ল উঁচু উঁচু গাছের সারি। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। লজে ছিল থাকার ব্যবস্থা। সামনের বিপুল জলরাশি আছড়ে পড়ছে বাঁধানো দেওয়ালে। রয়েছে সারি দেওয়া নারকেল গাছ আর ছোট ছোট কটেজ। নাম না জানা কত পাখি, ঝিনুক, কোরাল আর মন কেমন করা সাঁঝবেলা। পরদিন সকালে কালাপাথর বীচ দেখে রাধানগর বীচে স্নানের আনন্দ উপভোগ করলাম। বিশাল বীচ। একপাশে সমুদ্র, আর তার পাড় জুড়ে শুধুই গাছের সারি। অবিরাম ঢেউ ভেসে এসে কূলে ঝাপিয়ে পড়ছে। সামনেই ডিমের আকারে ইগলুহাট। ভাড়া নিয়ে সমুদ্রের ধারে থাকা যায়। আর অবশ্যই এখানকার ডাবের জলের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।
কয়েকদিন ধরে আন্দামানের নানান সি-বিচ উপভোগ করার পর এবার সেখানকার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখার পালা। এক সকালে পৌঁছে গেলাম বিখ্যাত সেলুলার জেলে। দিনটা ছিল ১৫ আগষ্ট। জেলের বিভিন্ন জায়গা দেখতে দেখতে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। দেখলাম ফাঁসি ঘরও। মনে হল কত বিদ্রোহী বন্দির রক্তে রাঙা এই আন্দামান। ওয়ান্ডুরে রেড স্কীন আর জলিবয় দেখতে গিয়ে অবিভূত হলাম। দ্বীপে যাওয়ার পথে জলের রঙ যেন গলানো কাচ। আর তার তলায় যেন স্বর্গের দেবতা রঙীন মাছ আর কোরাল দিয়ে অ্যাকোরিয়াম বানিয়ে রেখেছে। জলিবয়ে স্নান করার মজাই আলাদা। এতটাই স্বচ্ছ জল যে উপর থেকে জলের তলায় থাকা পুরো শরীরটাই দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল চ্যাতাম। এশিয়ার সবচেয়ে বড় স-মিল এখানে। রয়েছে মিউজিয়ামও। গাড়ি সমেত চ্যাতাম থেকে ফেরি পার হয়ে পৌঁছালাম মাউন্ট হ্যারিয়েট। উপর থেকে দেখতে পাওয়া যায় নিচে ‘নিকোবরী হাউজ’। বনের ভিতরে সুন্দর সুন্দর ছবির মতো কটেজ। উপর থেকে দেখা যায় সমুদ্র ঘিরে রেখেছে পাহাড়কে। জঙ্গলে বিভিন্ন পাখি। জানোয়ার বলতে সাপ আর ভাল্লুক।
আন্দামান সফরে অন্য অনুভূতির সাক্ষী হয়েছিলাম লিটল আন্দামানে গিয়ে। ছোট পাখির মত ৬ জন বসার মত ছোট্ট প্লেনে হালকা মেঘের ভিতর দিয়ে ভেসে চলা। তারপর সমুদ্রের মধ্যিখানে রান করে ভাসমান প্যান্টুনে গিয়ে নামা। আর এরপর ছোট্ট বোটে করে পাড়ে গিয়ে ওপরে ওঠা। ঝরনা, পাম ওয়েলের কারখানা, বিভিন্ন বীচ, নিকোবরী পাড়া সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। আর এখানে দেখেছি সবুজের সমাহার। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার নারকেল গাছের সারি। চারিপাশে সমুদ্র, আর তার মাঝে লিটল আন্দামান যেন অপরূপা।
 

 

 

লেখক: অপর্ণা চ্যাটার্জি